Homeইত্যাদিমোদের গরব মোদের আশা আ মরি বাংলা ভাষা

মোদের গরব মোদের আশা আ মরি বাংলা ভাষা

একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। তাই আজ আমার মাতৃভাষা,পিতৃ ভাষা সিলেটি ভাষা নিয়ে কথা বলতে চাই। কাজের ক্ষেত্রে  বলা চলে ত্রিপুরায় বিভিন্ন জায়গার লোক বসবাস করে বলে এখন আমাদের এই ভাষা সব জায়গায় প্রয়োগ হয় না।সুমধুর এই ভাষা নিয়ে আজ কথা বলব। 

এই যে উপরে লিখলাম বালা নি আফনে?এর মানে কি জানেন? ভালো আছেন কি? আপনি ভালো আছেন? সঙ্গে সঙ্গে উত্তরএল ” অয় বালা আসি”মানে হ্যাঁ ভালো আছি.।বাকি আরো কয়েকটা লাইন তুলে ধরলাম যদি আমার এই লেখা আর এই ভাষা ভালো লাগে তাহলে অনুগ্রহ করে একটু শুনে নেবেন। লেখার চেয়ে শুনতে বড় মধুর এই ভাষা। 

এখন আসা যাক মূল স্রোতে। সিলেটি ভাষা মূলত বাংলাদেশের সিলেট বিভাগ ও ভারতের আশপাশে অঞ্চল যেমন আসাম, ত্রিপুরা, মেঘালয়,মনিপুর নাগাল্যান্ড এবং বিশ্বজুড়ে প্রবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে ব্রিটেন ও উত্তর আমেরিকা থেকে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অংশে সিলেটি ভাষাভাষীর লোক রয়েছে।  ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন রাজ্যে  মূলত এখানকার বাঙালিরা সিলেটের এই ভাষাকে যথাযোগ্য মর্যাদায় এখনো সসম্মানে বলেন। সিলেটি একটি ইন্দো – আর্য ভাষা.উইকিপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী প্রায় ২ কোটি  লোকের কথা বলার বা মনের ভাব প্রকাশ করার মাধ্যম এই ভাষা।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

প্রশ্ন জাগছে নিশ্চয়ইএই সিলেটি ভাষার উৎপত্তি নিয়ে?আগেই বলে দেই এটি বাংলার একটি উপভাষা। মানে নিজস্ব ভাষা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। যদিও বেশিরভাগ ভাষাবিদ এই ভাষাকে স্বাধীন ভাষা বলে মনে করেন। অনেক  স্থানীয় ভাষাভাষীর কাছে সিলেটি ভাষা দ্বিভাষিক আঞ্চলিক ভাষায় হিসেবে ব্যবহৃত হয় যেখানে প্রমিত বাংলা ভাষাটি কোডেড লেকচার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। অনেকে আবার এই ভাষাকে বাংলা ভাষার একটি দুর্নীতিগ্রস্ত রূপ হিসেবে বিবেচনা করেন। 

তবে যে যাই বলুক না কেন সিলেটি  ভাষাভাষী লোকেদের কাছে এটা অহংকারের ভাষা। এই ভাষার আলাদা লিপিও রয়েছে “সিলেটি নাগরী” লিপি নামে পরিচিত। 

ছোটবেলা থেকেই আমার ঘরে বাবা জেঠু সবাই এই ভাষায় কথা বলতেন। কিন্তু যেহেতু আমরা ত্রিপুরা তে  থাকতাম তাই কাজের খাতিরে পরিবেশগত পার্থক্যের কারণে এই ভাষা এখন প্রায় হারিয়ে যাচ্ছে। হারিয়ে যাচ্ছে বলা চলে না, আসলে কিছু সংখ্যক মানুষের মধ্যে অন্তত ত্রিপুরাতে সীমাবদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। 

যেহেতু ত্রিপুরা ও উত্তর পূর্বাঞ্চলের অনেকেই পূর্ব বাংলা থেকে এসেছেন তাই উত্তর পূর্বাঞ্চলে বিভিন্ন ভাষার মেলবন্ধন দেখা যায়। সিলেটি ভাষা নাম থেকেই বোধ হয় বুঝতে পারছেন এই ভাষাটি মূলত বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চল থেকে। এর এক বিশাল ইতিহাস রয়েছে। চলুন কথা বলি সেই সব ইতিহাস নিয়ে। 

সিলেটি ভাষার উৎপত্তি :

সিলেটি ভাষা মূলত  পূর্ব ইন্দো আর্য ভাষাগুলির অন্তর্গত যা মাগোধী প্রাকৃত থেকে উদ্ভূত হয়েছিল।সিলেটের আশেপাশে নিচু জায়গাগুলিতে মূলত প্রাচীন খাসি জনগোষ্ঠীর লোক বসবাস করত এবং প্রাচীনতম ইন্দো আর্য বসতি স্থাপন করা হয়েছিল ষষ্ঠ শতাব্দীতে কামরূপ রাজার অধীনে। ষষ্ঠ শতাব্দীতে প্রাচীন সুরমা উপত্যকা ও বরাক উপত্যকা ভাষা হিসেবে পরিচিত হয় ই সিলেটি ভাষা। বলা চলে এই ভাষার বয়স ১৫ শতাব্দীর পুরানো। দশম শতাব্দীর পর সিলেট (শ্রীহট্ট) নিচু জায়গায় এবং পরে একাদশ শতাব্দীর শ্রীহট্ট রাজা কেশব দেব এবং ঈশান দেবের ভাতেরার  অনুদান সংস্কৃত ভাষায় রচিত হয়েছিল। বাংলাদেশের মৌলভীবাজারের রাজনগরের পশ্চিমভাগ গ্রামে আরেকটি উল্লেখযোগ্য তাম্রলিপি পাওয়া গেছে যা দশম শতাব্দীতে রাজা শ্রীচন্দ্র জারি ছিলেন। 

সিলেটি ভাষার ইতিহাস কিন্তু অনেকটা বিস্তৃত। ১৩০৩ খ্রিস্টাব্দে সিলেটের মুসলিম বিজয় পশ্চিমা দেশ থেকে আসা মুসলমানদের অভিবাসন কে প্রসারিত করে তাই সিলেটি ভাষায় আরবি ও ফার্সি প্রচুর সংখ্যক শব্দের উদ্ভব করে। স্থানীয় ভাষার উপর ফার্সি -আরবি প্রভাব দেখা গেছে।

আচ্ছা আগেই বললাম, এই ভাষার  আলাদা লিপিও রয়েছে যা “সিলেটি নাগরী “নামে পরিচিত। বিস্তৃত আলোচনায় আর নাইবা গেলাম। সময় পাল্টালো। ১৯০৩ সালে গ্রিয়ারসন রিপোর্ট যে সিলেটি ভাষা কেবল তৎকালীন সিলেট জেলারজেলা (বর্তমানে বাংলাদেশের সিলেট বিভাগ এবং আসামের করিমগন্জ জেলা)  মধ্যে সীমিত থাকবে।আমাদের পৈত্রিক বাড়ি যেহেতু আসামের করিমগঞ্জ জেলায় তাই এই ভাষা আমাদের  ও মাতৃভাষা। যাইহোক, জানা যায় ছেলেটি শব্দ ভান্ডারের সর্বপ্রথম একটি ডকুমেন্টেশন প্রকাশিত হয় ১৮৫৭ সালে। 

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

সিলেটি লিপি :

সিলেটিতে বর্তমানে কোন লেখার ব্যবস্থা নেই। ঐতিহাসিকভাবে সিলেট অঞ্চলে সিলেটি নাগরী বাংলা লিপির পাশাপাশি  ব্যবহৃত হতো। তবে সিলেটি নাগরী বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ধর্মীয় কবিতা লেখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল বলে জানা গেছে। ভারতবর্ষের কোথাও এই লিপি এখন আর ব্যবহৃত হয় না। 

সিলেটি ভাষাভাষীর বিস্তার :

ভারতের দক্ষিণ আসাম অঞ্চলের বড়া কুকুর তোকায় সিলেটি ভাষা ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয় যার মধ্যে কাছার হাইলাকান্দি এবং অন্তর্ভুক্ত। এটি ত্রিপুরার উত্তর অংশে এবং মনিপুরের বিদিব আমি ও প্রচলিত। মধ্য আসামের জেলা মেঘালয়ের শিলং এবং নাগাল্যান্ড রাজ্যে ভাষাভাষীর দের একটি উল্লেখযোগ্য জনসংখ্যা রয়েছে। শুধু উত্তর পূর্বাঞ্চলেই নয় কলকাতায় ও কিছু সংখ্যক লোক বাস করেন যাদের বেশিরভাগই আসাম থেকে আসা। প্রত্যেকের একটাই লক্ষ্য এই লুপ্ত প্রায় সিলেটি ভাষাকে আবার যেন তার পরিচয় মিলে। এখনো যারা অল্পস্বল্প এই ভাষায় কথা বলতে পারেন তাদেরকে নিয়ে একটা জমানোর এখনো চেষ্টা চলে। 

শুধু কি ভারত আর বাংলাদেশ না ভারতীয় উপমহাদেশের বাইরে সিলেটি ভাষাভাষীদের বৃহত্তম গোষ্ঠী যুক্তরাজ্যে বাস করে। যার মধ্যে ৯৫% ব্রিটিশ বাংলাদেশী সিলেট অঞ্চল থেকে এসেছেন। ধারণা করা হয় যে যুক্তরাজ্যে চার লাখেরও বেশি সিলেটি ভাষাভাষীর লোক বসবাস করেন। টাওয়ার হ্যামলেটসের মতোপূর্ব লন্ডনের সিলেটের লোকেরা বসবাস করেন। সাবলীল ভাবে অন্য কোন সিলেটি মানুষকে পেলে আঁকড়ে নেয় ভাষার টানে। 

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

সিলেটি আর বাংলা ভাষা প্রায় সমান সমান। শুধু উচ্চারণ গত কিছু তফাৎ ও বলার ভঙ্গির মধ্যে তফাৎ রয়েছে। নিজস্ব একটি অভিজ্ঞতা ব্যাখ্যা করছি। গত বছরই বাংলাদেশের অস্থির পরিবেশ শুরু হওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে আমার হঠাৎ ইচ্ছে হল বাংলাদেশে আমার ঠাকুর দাদার বাড়ি যেখানে ছিলেন সেখানকার জায়গা সম্পর্কে জানার। সে মত আমি আমার এক বন্ধুর কথায় ফেসবুকের একটি পেইজে আমার পরিবারের পুরনো ছবি আর শুধু গ্রামের নামটা জানতাম বলে বাংলাদেশ থেকে সেই জায়গাটা কোন একজন যেন আমাকে দেখায় সেটা আশা রেখে একটা লেখা লিখেছিলাম। আমি তো সাধারণ একটা লেখা লিখেছিলাম কিন্তু ওই যে সিলেটিদের টান। সে হাজার হাজার কমেন্ট হাজার হাজার ভিউ হাজার হাজার লাইক, শেয়ার।  আমি দেখলাম, ছেলেদের মধ্যে আন্তরিকতার সেই অদ্ভুত টান। চল্লিশের দশকে আমার ঠাকুর দাদা চাকরি শুদ্ধ পৈত্রিক ভিটে বিক্রি করে আসামি চলে এসেছিলেন। আত্মীয়-স্বজন বলতে কেউই নেই। কিন্তু সিলেটি মেয়ে বলে সুদূর বাংলাদেশ লন্ডন থেকে মানুষ ফোন করে সেই জায়গা দেখানোর চেষ্টা করে। সেদিন থেকে মনে হল এক ভাষার টান কতটা। সাত সমুদ্র তের নদী পার থেকেও মানুষকে কাছে টেনে আনে।Raise Your Concern About this Content

সিলেটি ভাষাকে বাঁচানোর জন্য অনেক গ্রুপ তৈরি হয়েছে যারা নিজেদের এই ভাষাকে টিকিয়ে রাখতে এবং পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে চেষ্টা করছে। কলকাতায়ও এমন অ্যাসোসিয়েশন রয়েছে। আর্টিকেলে তথ্যসূচিতে আমি সেই এসোসিয়েশনগুলোর নাম উল্লেখ করে দেবো। কখনো সময় করে একটু সিলেটি ভাষার ভিডিও গুলো দেখবেন। সিলেটি ভাষায় রয়েছে সেটা ২ মিনিটের। দেখলে হাসতে হাসতে পেটে ব্যথা হয়ে যাবে।এটা নির্দ্বিধায় বলতে পারি, শুনতে পাবেন শুধু সিলেটি রান্না মাছ ও রাইসাক, বোয়াল মাছ, আঠালো ভাত, সরষে তরকারি, পাতলা ঝোলের গল্প। সিলেটি মানুষ মানেই রশিক। আর রশিকদের সঙ্গে একটু গল্প করে দেখবেন ওরা যেমন জ্ঞানী তেমনি হাসাতেও জানে।বুঝতেই তো পারছেন এখনো আশি উর্ধ সিলেটি ব্যক্তি চান সিলেটি ভাষাকে যেন সবাই শুনতে পারে ভালবাসতে পারে। মাতৃভাষা দিবসে এটাই আমার মাতৃভাষার প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য। 

তথ্যসূচি :

সঙ্ঘমিত্রা ভট্টাচার্য
সঙ্ঘমিত্রা ভট্টাচার্যhttps://staging.biswabanglahub.com
আমি সংঘমিত্রা ভট্টাচার্য। পেশায় একজন মিডিয়া কর্মী এবং গত ১৭ বছর ধরে বিভিন্ন স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে। সাংবাদিকতার মাধ্যমে মানুষের গল্প, সমাজের বাস্তবতা এবং আমাদের সংস্কৃতিকে তুলে ধরাই আমার মূল লক্ষ্য। বিশেষ করে ভ্রমণকাহিনি, উত্তর–পূর্ব ভারতের সংস্কৃতি, ঐতিহ্যবাহী খাবার এবং মানুষের জীবনধারা নিয়ে লিখতে আমি ভীষণ আগ্রহী। একজন উত্তর–পূর্ব ভারতের নারী হিসেবে আমি আমার রাজ্য এবং দেশের বৈচিত্র্য, সৌন্দর্য ও সংস্কৃতিকে বৃহত্তর বিশ্বের সামনে তুলে ধরতে চাই। আমার বিশ্বাস, গল্প ও লেখার মাধ্যমে আমরা আমাদের মাটির গন্ধ এবং মানুষের হৃদয়ের কথা সবার কাছে পৌঁছে দিতে পারি।
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- বিজ্ঞাপন -spot_img

Most Popular