Homeসময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলেছে বাংলা চলচ্চিত্র জগৎ

সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলেছে বাংলা চলচ্চিত্র জগৎ

ভাবো তো, একটা কালো-সাদা ফ্রেমে একটা মেয়ে নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে আছেন, বাতাসে উড়ছে তাঁর শাড়ির আঁচল, চোখে স্বপ্ন। সিনেমার পর্দায় তখন প্রথমবার ‘পথের পাঁচালী’। তখন থেকেই শুরু, বাংলার সিনেমার এক অবিশ্বাস্য যাত্রা।

এই লেখায় চলো, দেখি সময়ের সাথে বাংলা সিনেমা ঠিক কেমন করে এগিয়ে চলেছে। —নতুন ভাষা পেয়েছে, নতুন দর্শক পেয়েছে, কিন্তু আবেগটা ঠিক আগের মতই থেকে গেছে। সঙ্গে থাকছে কিছু সিনেমা, যাদের গল্প শুধু পর্দায় থেমে থাকেনি—আমাদের মনে গেঁথে গেছে।

শুরুর গল্প: ধ্রুপদী সাদা-কালো যুগ (১৯৫০–১৯৭০)

বাংলা সিনেমার সূচনা হয় বেশ আগেই, তবে ১৯৫৫-তে সত্যজিৎ রায়ের ‘পথের পাঁচালী’ যেন সিনেমার ভাষা বদলে দিল। সিনেমা তখন আর শুধু বিনোদন নয়, একরকম শিল্প। ‘অপরাজিত’, ‘অপুর সংসার’, ‘চিদানন্দ দাসগুপ্ত’র কাজ—সবমিলিয়ে বাংলার সিনেমা হয়ে উঠল আন্তর্জাতিক। এই সময়টা কে বলে ‘Golden Era of Bengali Cinema’। সিনেমা তখন শুধু বিনোদন নয়—বিবেক, বোধ আর বাস্তবতার প্রতিফলন।
পথের পাঁচালী (১৯৯৫, সত্যজিৎ রায়):
প্লট: অপু আর দুর্গার ছোট ছোট আনন্দ-বেদনার গল্প। গ্রামবাংলার বাস্তবতা, দারিদ্র্য আর সম্পর্কের সূক্ষ্ম রূপ।

ছবির একটি অংশে:পথের পাঁচালী’র অনবদ্য চিরন্তন মুহূর্ত।। ফটো: ছবি থেকে সংগৃহীত

আমাদের শিখিয়েছে: ছোট ছোট জিনিসেও যে কতখানি আবেগ লুকিয়ে থাকে। একটা হরিণদেখা বা কাশফুলের মাঝে দিয়ে কত কিছু বলা যায়!

মেঘে ঢাকা তারা (১৯৬০, ঋত্বিক ঘটক):

প্লট: নিখিলেশ আর নীতা—দেশভাগের পরে টালমাটাল এক পরিবারের গল্প।
আমাদের শিখিয়েছে: ত্যাগ, হতাশা আর নিঃস্ব জীবনের মধ্যেও এক রকম সৌন্দর্য থাকে। নীতা যখন বলে “Dada, ami bachte chai”—মনে পড়ে তো?
সত্যজিৎ রায় – ব্রিটানিক্কা
পথের পাচালি – আইএমডিবি

বাণিজ্যিক বনাম শিল্পচর্চা (১৯৭০–১৯৯০):

এই সময়টা ছিল টানাপোড়েনের। একদিকে মৃণাল সেন, ঋত্বিক ঘটক, গৌতম ঘোষের মতন পরিচালকরা বানাচ্ছেন সমাজচেতনার সিনেমা। ‘মৃগয়া’, ‘মেঘে ঢাকা তারা’, ‘আকালের সন্ধানে’—গভীর, চিন্তামূলক সিনেমা।

আরেকদিকে, কমার্শিয়াল ধারার সিনেমায় চলে আসে এক্সট্রা ড্রামা, মারপিট আর হিরোইজম। তাপস পাল, চিরঞ্জিত, প্রসেনজিৎ ছিলেন এই ধারার মুখ। এই সময়ে বাংলা সিনেমা মূলধারায় একটু পিছিয়ে পড়ে, কিন্তু তার মধ্যেও শিল্পচর্চা থেমে যায়নি। বাংলা তখন আন্দোলনের শহর, বিদ্রোহের শহর। সিনেমাও তার ছাপ বহন করে। Raise Your Concern About this Content

ইন্টারভিউ (১৯৭১, মৃণাল সেন):

প্লট: চাকরি পেতে হলে ওয়েস্টার্ন পোশাক পরতে হবে—সেই নিয়ে এক মধ্যবিত্ত যুবকের সংকট।
আমাদের শিখিয়েছে: পশ্চিমা প্রভাবে আমরা নিজেদের সংস্কৃতিকে কতটা হারাচ্ছি।

ছবির একটি দৃশ্য : বিকেল গড়িয়ে যাওয়া শহরের কোলাহলে ‘The Interview’এর নীরব ভাষ্য।। ফটো: ছবি থেকে সংগৃহীত

হীরার আংটি (১৯৯২, রিন্টু ঘোষ, গল্প: সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়):

প্লট: রহস্যে মোড়া এক জাদুকর, এক হীরের আংটি আর এক কিশোরের অ্যাডভেঞ্চার।
আমাদের শিখিয়েছে: সাহস, কল্পনা আর শিশুমনের চোখ দিয়ে দুনিয়া দেখতে শেখা।
মৃণাল সেন-ব্রিটানিক্কা
রিটউইক ঘটোক – উইকিপিডিয়া
গৌতম ঘোষ – উইকিপিডিয়া
ইন্টারভিউ- আইএমডিবি
হীরার আংটি-আইএমডিবি

মন্দার দিন আর তার চ্যালেঞ্জ (১৯৯০–২০০৫):

ছবির একটি দৃশ্য : উনিশে এপ্রিল’এর নিঃশব্দ বিদ্রোহ, এক মেয়ে ও তার মা’র মুখোমুখি।। ফটো: ছবি থেকে সংগৃহীত

এই সময়টা ছিল বাংলা সিনেমার ‘low phase’। বলিউডের ভেল্কি, টিভির দাপট, আর গল্পের অভাবে বাংলা সিনেমা দর্শক হারায়। ফর্মুলা সিনেমা, বাজেট কম, নতুন মুখ নেই—এইসব মিলিয়ে হলগুলো ফাঁকা হতে থাকে।

তবে এই সময়েও কিছু সাহসী কাজ হয়েছে। রিতুপর্ণ ঘোষের আগমন ঘটে। ‘উনিশে এপ্রিল’, ‘দহন’, ‘চোখের বালি’—একেকটা সিনেমা নারী, সম্পর্ক, সমাজ নিয়ে ভেবেছে অন্যভাবে। এই সময় টলিউডে আবারও আলো জ্বলে।
ঋতুপর্ণ ঘোষ-উইকিপিডিয়া

নবজাগরণ: আধুনিক বাংলা সিনেমার উত্থান (২০০৫–২০২০):

Hemlock Society’র এক চঞ্চল অথচ থেমে থাকা মৃত্যু কামনার গল্প।। ফটো: বাসু কর

২০০০ এর পর থেকে বাংলা সিনেমায় এক নতুন ঢেউ আসে। সৃজিত মুখার্জি, কৌশিক গাঙ্গুলী, অনীক দত্ত, রাজ চক্রবর্তী, অরিন্দম শীল—এরা বাংলা সিনেমাকে আবার বাঁচিয়ে তোলেন।

‘অটোগ্রাফ’, ‘চতুষ্কোণ’, ‘বিসর্জন’, ‘জাতিস্মর’, ‘হেমলক সোসাইটি’, ‘মুখোমুখি’—বলা যায়, গল্প বলার ধরনটাই পালটে গেল। পাশাপাশি ইন্দ্রদীপ দাশগুপ্ত আর কমার্শিয়াল ধারার ‘চ্যালেঞ্জ’, ‘বোঝে না সে বোঝে না’ ইত্যাদি সিনেমাও আলাদা জায়গা করে নেয়। Raise Your Concern About this Content

তথ্যসূত্র:

উজ্জয়িনী হালদার
উজ্জয়িনী হালদার
ইলেকট্রনিকসের শিক্ষার্থী উজ্জয়িনী এক প্রগতিশীল কন্টেন্ট বিশেষজ্ঞ হিসেবে প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং গল্প বলার চাতুর্যের একটি অনন্য সমন্বয় গড়ে তুলেছেন। পড়াশুনোর পাশাপাশি স্বাধীন লেখিকা উজ্জয়িনী ডেটা ভিত্তিক অন্তর্দৃষ্টির মাধ্যমে আকর্ষণীয় ডিজিটাল গল্প তৈরি করেন। জটিল ধারণাগুলোকে সহজে বোঝানোর জন্য চিত্তাকর্ষক কন্টেন্ট তৈরিতে পারদর্শী উজ্জয়িনীর লেখনীতে বিশ্লেষণাত্মক চিন্তা ও সৃজনশীলতা সমন্বয় পাওয়া যায়। সাধারণ পাঠকদের জন্য কঠিন প্রযুক্তিগত বিষয় অনুবাদ করা কিংবা একাধিক প্রকল্প পরিচালনা, সকল কাজেই তিনি কৌতূহলী ও সহযোগিতার মনোভাব নিয়ে সঠিকভাবে কাজ করে চলেছেন।
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

বাংলা ক্যালেন্ডার

- বিজ্ঞাপন -spot_img

Most Popular

Recent Comments