Homeইত্যাদি আমাদের ছোট বেলার সরস্বতী পুজো; কিছু স্মৃতিচারণ -

 আমাদের ছোট বেলার সরস্বতী পুজো; কিছু স্মৃতিচারণ –

 মাঘ মাসের এই বিশেষ দিনটিতে কনকনে শীতের ভোর বেলা কুয়াশার চাদর সরিয়ে গায়ে কাঁচা হলুদের প্রলেপনে স্নান সেরে শুদ্ধ হয়ে শুরু হতো আমাদের পুজো। সাথে ছিল কিছু রীতি-নিয়ম। পোশাক পরিধানে হলুদ অথবা সাদা রংই বেছে নেওয়া হতো। শ্বেত শুভ্র অথবা বাসন্তী শাড়িতে মা সরস্বতীর প্রতিমার সামনে সাজানো পুষ্পপত্রে হলুদ কমলা গাঁদার মধ্যে উঁকি দিতো লাল উজ্জ্বল পলাশ ফুল। বাকদেবী মায়ের ভোগ হিসাবে উৎসর্গীকৃত থাকতো নৈবিদ্য, খইয়ের মুড়কি, নারকোলের নাড়ু সহযোগে লুচি মিষ্টি খিচুড়ি পায়েস ইত্যাদি। নিষেধের কুল ফল মান্যতা পেত। পুজো সমাপ্তে বেলপাতায় ওম শ্রী সরস্বত্যৈ নমঃ মন্ত্র দোয়াতে ডুবিয়ে খাগ দিয়ে লেখা ছিল এক অনিবার্য নিয়ম। ঠাকুরদার কোলে বসে নতুন শ্লেটহাতেখড়ির শুভ অনুষ্ঠান সম্পন্ন হতো সদ্য অ-আ-ক-খ-১-২-A-B-C-D শেখা ভাই-বোনদের। 

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

স্কুল কলেজের পুজোগুলির পাশাপাশি তখন পাড়ায় পাড়ায় অলিতে গলিতে ছোট মাঝারি বিভিন্ন আকারের পুজো দেখা যেত।কচিকাঁচারা মন্ডপ সাজাতো তাদের নিজস্ব শৈলীতে। তাতে থাকতো অপটু হাতে তৈরী নানা ডেকরেশন, সাদা কাগজের ওপর রঙিন কোলাজ বা পাট কাঠিতে সাজানো মণ্ডপের ছাঁদ। পাড়ার মধ্যেই কোনো  কোনো বাড়ি ঘেসে তৈরী হতো সরস্বতী পুজোর অস্থায়ী তাবু প্যান্ডেল, তাতে সারা রাত জেগে মন্ডপ তৈরির সাথে চলতো আড্ডা গল্প চা সিঙ্গারা মুড়িমাখার এক অনবদ্য সমন্বয়। কচিকাঁচাদের যে ব্যাস্ততায় রাত শেষ হয়ে যেত, হয়তো সময় ধরে এগোলে তা পূর্ণ হয়ে যেত সহজেই। তবুও শেষ রাতের পরে থাকা কাজ অতি দ্রুত ব্যাস্ত হাতে  নামানো যেন, ছোট হয়েও বিরাট কিছু করার দারুন অভিজ্ঞতা সঞ্চয়। পুজোর দুমাস আগে থেকেই চলতো চাঁদা তোলার পর্ব। আর তাতে পরিকল্পনার অভাব ছিলোনা। ঘরে ঘরে ঢুকে প্রতিবেশীদের থেকে চাঁদা তোলার ব্যাপারে বড়রা এগিয়ে দিতো ছোটদের, পাড়ার কোনো কাকু  চাঁদার বদলে বকা দিলে বড়দের মান সম্মানে লাগার ব্যাপারটা এড়ানো যেত, কিন্তু মুশকিল হতো চাঁদায় তাদের নাম লেখার সময় , সবে স্বরবর্ণ ব্যাঞ্জন বর্ণের পাঠ শিখে নামের যুক্তাক্ষর গুলো ভুল হয়ে যেত। Raise Your Concern About this Content

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

এরপর শুরু হতো রাত জাগা পরিকল্পনা – মন্ডপ প্রতিমা কেমন হবে ? কচিকাঁচাদের মাথা থেকে ধারণার ছবি স্পষ্ট হলে চলতো তা রূপায়ণের কাজ। শীতের সময়ের পুজো বলে তখন প্রায় সব বাড়িতেই ডালিয়া চন্দ্রমল্লিকা শোভা পেতো ,আর তা থেকেই এ বাড়ি ও বাড়ি থেকে বয়ে আনা ফুলের টবে চলতো মণ্ডপের শোভা বাড়ানোর কাজ। শেষে পুজো শুরুর মাহেন্দ্রক্ষণ পেরিয়ে গেলে চলতো এ পাড়া ও পাড়াতে পুজো শেষ করে ফেরা পুরোহিতের খোঁজ। 

জয় জয় দেবী চরাচর সারে কুচযুগ শোভিত মুক্ত হারে বীণা রঞ্জিত পুস্তক হস্তে ভগবতী ভারতী দেবী নমস্তে – এই মন্ত্রেই ছোট ছোট হাতে ধরে রাখা ফুল পুষ্পাঞ্জলি হয়ে ঝরে পড়তো মা সরস্বতীর পায়ে। পুজো নির্বিঘ্নে শেষ হওয়ার পর চলতো পরের কয়েকদিনের প্রস্তুতি। তাতে থাকতো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বাংলা ব্যান্ড এর জমজমাট রক আর পপ, বসে আঁকো প্রতিযোগিতা, কুইজ, শঙ্খ ধ্বনি, মিউজিক্যাল চেয়ার, হাড়িভাঙ্গা, একটি কাঠিতে কত মোমবাতি জ্বালানো যেতে পারে সেই সব মজাদার প্রতিযোগিতা। তাতে পুরস্কার থাকতো বলা বাহুল্য। শেষে খিচুড়ি বাঁধাকপি চাটনি পায়েস দিয়ে পরিপূর্ণ হতো আমাদের ছোটবেলার পাড়ার সরস্বতী পুজো। 

স্কুলের পুজোর আনন্দ ছিল আর এক রকম। সেখানে কয়েক সপ্তাহ আগে থেকে বসত আনন্দের হাট। যেমন সব বন্ধুরা মিলে বিভিন্ন স্কুলকে আমন্ত্রনের চিঠি দিয়ে আসা, পুজোর আগে ভোগ প্রসাদের নতুন আলুর খোসা, কড়াইশুঁটির দানা ছাড়ানো,একসাথে বসে প্রসাদ গ্রহণ ইত্যাদি। স্কুলের কাজ অথচ তা রুটিনের বাইরে -সে এক ভীষণ আনন্দের দিন ছিল। 

শাড়ি ও পাঞ্জাবির চিরকালীন যুগল বন্দি  – সরস্বতী পুজো আর সাথে শাড়ি ও পাঞ্জাবি পরিধান ও তার জনপ্রিয়তা  বহুদিনের। পুজোর দিন ছোট ছোট মেয়েদের জড়ানো হলুদ শাড়ি আর ছোট ছেলেদের পরিহিত পাঞ্জাবির দৃশ্য সত্যি মজাদার। ছোটবেলার সেই সব নয়নাভিরাম দিন গুলো আজও বর্তমান। বছরের অন্যান্য দিন হোক না হোক, এই পুজোর দিনটি বাঙালি কন্যার শাড়ি পরিধান চাইই । 

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

বর্তমান প্রজন্ম -হাতের কাছে স্মার্ট ফোনে হয়তো গোটা দুনিয়া আছে, কিন্তু স্মৃতির মনিকোঠায় রত্ন- উজ্জ্বল সেই সব আনন্দ গুলো এখন ফিকে। এখন “শো অফ” এর সেলফিতে প্রানোজ্জ্বল অনুভূতি আর নেই। হয়তো সময় যে আবহে চলছে তাতে এটাই স্বাভাবিক। এই অনুভূতি বেদনাদায়ক তো বটেই সাথে আছে এই প্রজন্মকে তা সেই ভাবে ফিরিয়ে দিতে না পারার এক ব্যর্থতা বোধ।  

পুজোর শ্বাশ্বত আধ্যাত্মিক দিক : সৃষ্টি তত্ত্বের রূপক প্রজাপতি ব্রহ্মহা। তাঁর দৈবী শক্তি হলেন মা সরস্বতী। মায়ের শ্বেত শুভ্র রং বিশুদ্ধতার প্রতীক। বিদ্যার্থী নিষ্কলঙ্ক চরিত্রের অধিকারী হবে- তারই রূপক হিসাবে শ্বেত বসন। দেবী সরস্বতীর বাহন রাজঁহাস – যে দুধে জলে মিশে গেলে তার থেকে শুদ্ধ দুধ টুকু আহরণ করে নিতে পারে। এক্ষেত্রে সমাজে অনেক কলুষতা থাকলেও ছাত্র ছাত্রীরা শুধু ভালো দিকটিকে আদর্শ করে নেবে। 

Reference : 

১) আনন্দবাজার

২) সংবাদ প্রতিদিন 

৩) উইকিপিডিয়া 

৪) ব্রিটানিকা 

৫) টাইমস অফ ইন্ডিয়া 

দীপান্বিতা চক্রবর্তী
দীপান্বিতা চক্রবর্তী
একাধারে সাংবাদিকতা, মানবসম্পদ ও সৃজনশীল মিডিয়ায় সমৃদ্ধ অভিজ্ঞতা নিয়ে দীপান্বিতা আজ এক বহুমুখী লেখিকা। অনলাইন প্রকাশনা, ফিচার রচনা এবং স্ক্রিপ্ট উন্নয়নের ক্ষেত্রে তার অভিজ্ঞতা তাকে তীক্ষ্ণ সম্পাদকীয় দৃষ্টিভঙ্গি এবং গল্প বলার এক অনন্য দক্ষতা প্রদান করেছে। গণ সংযোগ ও মানবসম্পদ উন্নয়নে স্নাতকোত্তর দীপান্বিতা ডকুমেন্টারি স্ক্রিপ্টিং, ব্র্যান্ড স্টোরিটেলিং এবং গভীর গবেষণামূলক লেখায় এক উল্লেখনীয় অবদান রেখেছেন। প্রভাবশালী ব্লগ থেকে শুরু করে আকর্ষণীয় সামাজিক মাধ্যমের কনটেন্ট, বিভিন্ন শ্রেণীর পাঠকদের চাহিদা অনুযায়ী তার লেখনী শৈলী সবক্ষেত্রেই অনন্য। বিশ্ব বাংলায় তাঁর কাজ স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতার প্রতি দৃঢ় প্রতিশ্রুতির এক প্রতিফলন।
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

বাংলা ক্যালেন্ডার

- বিজ্ঞাপন -spot_img

Most Popular

Recent Comments